M.A.A. NAFISH PEEZON. Blogger দ্বারা পরিচালিত.
ভূতের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভূতের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মানুষ খেকো দানব ( কাল্পনিক )

undefined


এস.এস.সি পরিক্ষা শেষকি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না? একদিন আম্মা বলল চল সইয়ের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসিআমি, আম্মা, বদরুল, হাদীমামা সবাই মিলে কিশোরগন্জের পাকুন্দিয়া আম্মার সইয়ের বাড়ী বেড়াতে গেলামহৈ হৈ রৈ রৈ করে দিনগুলো খুব ভালই কাটছেএর মাঝে একদিন ঐ এলাকায় মাইকে প্রচার হচ্ছে যাত্রা হবেআমরা খুবই উৎফুল্লরাত্রে আমি, মামা, নয়ন ভাই, স্বপন, শরিফ, আরও তিনজন মিলে রওনা হলামমোটামুটি তিন কি.মি. রাস্তাতার মাঝে নাকি আবার নদী পার হইতে হয়

প্রচন্ড শীতখোলা গলায় গান ছেড়ে নদীর পাড় দিয়ে চলছিপাশের ঘন কাশবনের ফাক দিয়ে মাঝে মাঝে একজোড়া...দুই জোড়া চোখ এসে উকি দেয়উকি দিয়েই শেয়াল গুলো পাশের ঝোপে হারিয়ে যায়
মামা বলল শেয়ালেরা রাত্রে নদীর পাড়ে আসে কাকড়া খাওয়ার জন্য
আমরা মূল নদীরঘাটে এসে পৌছালামদেখি মাঝি নাই কিন্তু নৌকা আছেআমরা মাঝিকে ডাকাডাকি করতে লাগলে কিছুক্ষণ পর মাঝিকে দেখলাম কাশবন থেকে বেড়িয়ে আসলকিছুটা অপৃকতস্থ কি লেগেছিল? মনে নাইনদী পার হলামআরও এক কিলোমিটার
এবার কিন্তু সোজা কাশবনের ভিতর দিয়ে যেতে হবেছোট একটা রাস্তাবোঝাই যাচ্ছে এটা একটা কাশবনই ছিলমানুষ হাটতে হাটতে কিছুটা রাস্তা হয়েছেহালকা চাদনীদুইধারের কাশের জন্য দু্ইপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছেনাশুধু সামনে আর পিছনে দেখা যাচ্ছেকিন্তু সামনে আর পিছনের দুইপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকারকেননা চাদের আলো এতনিচে এসে পৌছাচ্ছেনাআমরা সবাই হাটছি তো হাটছিইকুয়াশা পরে দুইপাশের কাশগুলো কিছুটা নুয়ে পড়েছেফলে হাটার সময় আমাদের মুখে এসে লাগছেখুবই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার
অনেকক্ষণ যাবৎ আমি একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে কিছুক্ষণ পর পরই কাশবনের ভিতর একটা শব্দ হচ্ছেশেষবার যখন শব্দটা শুনলাম তখন আমার মনে হলো কিছু একটা আমাদের সাথে সাথে চলছেআর কিছুক্ষণ পরপর শব্দটা শুনিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছে বুঝলাম নাতবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর একই শব্দটা শোনা যাচ্ছেবন-জঙ্গল পরিষ্কার করে করে সামনে যাওয়ার যে শব্দটা ঠিক সেই রকমআমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলামতবে কারও কাছে কিছু বললাম না
সোজা সামনে হাটছি


থেকে থেকে শব্দটা আমি ঠিকই শুনতে পাচ্ছিএকটা জিনিস খুব অদ্ভুত লাগছিল যে সবাই কেমন জানি নির্বিকার, কেউ কি কিছু শুনতে পাচ্ছেনাতাহলে আমি কি কোন হ্যালুসেশানে আছিমানুষের চেচামেচি শোনা যাচ্ছেআমি আর মামাছাড়া আর বাকি সবাই দেখি দৌড় দিলআমরাও পিছনে পিছনে দৌড় লাগালাম
মোটামুটি সামনেই বসলামসবাই চিৎকার-চেচামেচি করছেদুইঘন্টা.........এরমাঝে আয়োজকদের একজন এসে বলে গেল চুপ করার জন্য এখনি নাকি যাত্রা শুরু হবে৫-১০ সেকেন্ট চুপ ছিল আবার চিল্লা-চিল্লিএবার স্থানীয় চেয়ারম্যানের অনুরোধসবাই চুপ 
নুপুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছেবাদ্যযন্ত্র বেজে উঠলনাচ শুরু হবে মনে হচ্ছেসে কি নাচ........নাচের তালে তালে দর্শকরা সবাই উন্মাতালমামার দিকে তাকিয়ে দেখি বসে বসে লাফাচ্ছেমামা আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা লজ্জা পেলকেউ কেউ টাকাও ছুড়ে মারছেনৃত্যশিল্পী টাকা কুড়িয়ে ব্লাউজের ফাক দিয়ে বুকে রাখছে আর গা থেকে ধীরে ধীরে কাপড় খুলে ফেলছেমামাকে দেখি বসা থেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে লাফাচ্ছেএদিকে দর্শক সারি থেকে কে জানি কাগজ দিয়ে বল বানিয়ে নৃত্যশিল্পীর গায়ে মারলশিল্পী কিছুটা বিব্রত বোঝাই যাচ্ছে
আয়োজককারীদের মধ্য থেকে একজন এসে অনুরোধ করে যাচ্ছে শৃঙ্খলা বজায় রাখতেঅহেতুক জামেলা কার সহ্য হয়? কেউ একজন ঐ আয়োজককারীর গায়ে জুতা ছুড়ে মারলসেচ্ছাসেবক দলের আট-দশজন মিলে একটা লোককে সনাক্ত করে মাইর শুরু করলসাথে সাথে দর্শকরাও ঝাপিয়ে পড়লমুহুর্তের মাঝেই হাজার হাজার মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করলশরীফ, স্বপন বলল মামা দৌড় দেন....বিরাট মাইর লাগব.......এই এলাকা খুব খারাপ
আমরা দৌড় লাগালাম
শরীফ, স্বপনরা সামনে দিয়া আমরা পিছনেদৌড়াচ্ছিতো... দৌড়াচ্ছিতো...পিছন দিয়া ধর ধর....জইল্যারে ছাড়িসনা.........মজিত্যা কই? এরকম হাজারও চিৎকার কানে ভেসে আসছেপিছনে তাকিয়ে দেখি হাজারও মানুষ দ্বিক-বেদ্বিক হয়ে দৌড়াচ্ছেআমরা তখন রাস্তাছেড়ে কাশবনের ভিতর দিয়া হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে আগাচ্ছিমামার জুতা ছিড়ে গেছেবেচারা ঐ জায়গায় বসে জুতার জন্য শোক করা শুরু করলমামা আবার ভীষন কৃপণতোআমরা মামাকে ধরে টেনে হিচড়ে ভিতরে যাচ্ছিধীরে ধীরে ধর ধর আওয়াজটাও স্তিমিত হয়ে আসছে
আমরা নদীরপাড়ে এসে দাড়ালামহালকা চাদনিঘাটে কেউ নেইসহজেয় বুঝতে পারলাম ভয়ে কেউ এদিকটায় আসেনিশরিফ বলল এখানে দাড়ানো মোটেও নিরাপদ নয়যে কোন ভাবেই নদীপাড় হতে হবেআমি আবার সাতার জানিনামামা বলল ভাগ্নে তুমি আমার কাদে উঠআমি রাজি হলামনাআমি সারাজীবন সব জায়গায় মাতব্বরি করতাম শুধু পানি ছাড়াকেননা হাজার চেষ্টা করেও যে সাতারটা শিকতে পারলামনাআমার সবসময় ভয় বেশী পানিতে গেলে নিচ দিয়ে যদি কেউ টান দেয়সবাই আমাকে অনেক বুঝানোর পরও রাজি হলাম নাসবাই নদীর পাড়ে দাড়িয়ে আছিএকটা অজানা আতংক সবার ভিতরে কাজ করছে
আল্লাহু... আল্লাহু... সবাই একটু ছড়ানো-ছিটানো থাকলেও দেখলাম মুহুর্ত্তের মাঝে একসাথে জড়ো হয়ে গেলশব্দটার উৎপত্তি বুঝার চেষ্টা করতে লাগলামএর মাঝে শুনলাম 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু....কাশবনের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে সে দিকে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা কাশবনের উপরদিয়ে দেখা যাচ্ছেআমরা সবাই সেদিকে তাকিয়ে রইলামআলোর তীব্রতা এবং শব্দের তীব্রতা বেড়েই চলছে


সবাই একদৃষ্টিতে ঐ দিকে তাকিয়ে আছিদেখি দুইজন মানুষ ঐ কাশবনের পথ দিয়ে বের হয়ে আসছেদুইজনের হাতে দুইটি হারিকেনপিছনে চারজনে কাদে করে একটি খাটিয়া নিয়ে আসলোসাদা কাপড়ে ঢাকাবুঝলাম কোন লাশ নিয়ে এসেছেতার পিছনে আরও দুইজন হারিকেন হাতেঅবাক হয়ে গেলাম
আসসালামু ওয়ালাইকুমসবাই সালামের জবাব দিলামসবার চোখে-মুখে উৎকন্ঠা স্পষ্টআমি একটু আগ বাড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার বলুনতোসবচেয়ে বৃদ্ধ যে লোকটা সে বলল "মৃত ব্যাক্তিটি হলো এই এলাকার জামাইশশুর বাড়ীতে এসেছিলসাপের কামড়ে সন্ধায় মৃত্যু হয়েছেএখন ঐ পাড়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে দাফনের জন্য।" সবার জড়তা মনে হয় একটু কাটল 

-
বাবা নৌকা নাই
-
না চাচা দেখি না তো
-
ঠিক আছে তাহলে আপনারা এইখানে লাশের পাশে দাড়ান আমরা গিয়ে নৌকা নিয়ে আসছি
এইটা কি কয়? মাথাটা আবার ঝিনঝিন করে উঠলএকটু সন্দেহও লাগছিলশেষে আমি বললাম আপনারা চারজন এবং আমর চারজন মিলে গিয়ে নৌকা নিয়ে আসবআর বাকি সবাই এখানে থাকুকচাচা মনে হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারলচাচার মুখে যে হাসিটা দেখলাম সেই হাসির রহস্য হাজার রকমের হতে পারে
আমরা আটজন মিলে রওনা হলামনদীর পাড়ে ধরে হাটছিসাথে দুইটি হারিকেনচাচা মনে হয় মাঝির বাড়ি চিনেসেই দেখলাম চিনিয়ে চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছেএকটা জায়গায় এসে চাচা থামলটর্চলাইট মেরে দেখলাম ঘাটে ঐ বিশাল নৌকাটা বাধা আছেজায়গাটা অনেক অন্ধকারনদীর পাড়ের উপরে বাড়ি ঘরও আছেকিন্তু মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুপুরীকিছুটা ভয় ভয় লাগছেএকটা প্যাচা উড়ে গেলপানিতে কিছু পড়ার শব্দঐ হাইল্যা... হাইল্যারে........বুঝতে পারলাম মাঝির নাম হালিমকোন সারাশব্দ নাইচাচা রাগে বলতে লাগল সবাই কি মইরা ভূত হয়ে গেছেশেষে আমরাই নৌকা নিয়ে আসলাম 
অনেক বড় নৌকানৌকার ছাদ নেইউপরে কাঠ দিয়ে মেঝে করা হয়েছেতবে মাঝখানে চার হাতের মত জায়গা ফাকাপানি সেচের সুবিধার জন্য এটা করা হয়আমরা এই ফাকের এক পাশে বসলামঅন্য পাশে ওরাআমি নৌকার শেষ মাথায় বসলামনৌকা যখন ছাড়বে, ঠিক তখনি কাশবনের ভিতর থেকে একটা আওয়াজ আসল 

-
বাবারা আমারে একটু নিয়া যাও
টর্চ লাইট মেরে দেখি এক বৃদ্ধলোকভাবলাম এতরাত্রে আমরা নিয়া না গেলে বেচারা কিভাবে পার হবে? তাই আমিই সবাইকে অনুরোধ করলাম নেওয়ার জন্যনৌকাটি ভাসিয়ে লোকটি লাফ দিয়ে নৌকায় উঠলনৌকাটি দোলনার মত দোল খেতে লাগলআমার কাছে মনে হলো সবাই নৌকায় উঠার পর নৌকাটি যতটুকু ডুবল ঐ লোকটি উঠার পর আরও বেশী ডুবললোকটি লাশের ঠিক পায়ের কাছে বসলনৌকা চলতে লাগল
খুব বেশী বড় নদী নাকিছুটা স্রোত আছেমনের ভিতর অজানা আশংকটা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করছি ততই মনে পড়ছেএই হালকা চাদনী রাতে কাশবনের উপরে কুয়াশার ধোয়া যে মায়াবী জাল সৃষ্টি করেছে তা আলিফ লায়লার কথা মনে করিয়ে দিলভয় কাটানোর জন্য মনে মনে গান গাওয়ার চেষ্টা করলামজোরকরেই কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে যেতে চাইলামদূরে ভেসে যাওয়া কলাগাছরুপী লাশগুলোকে একমনে দেখছিলাম
হঠাৎ যে নৌকা চালাচ্ছিল তার বিকট চিৎকারকেউ একজন পানিতে ঝাপিয়ে পড়ার শব্দআমি ঘুরে তাকাতে তাকাতেই সমস্ত নৌকাটা দুলে উঠল যেন কোন নীলদড়িয়ায় নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়েছেসবাই লাফিয়ে পানিতে পড়ছেমামা চিৎকার করে পানিতে লাফ দেওয়ার জন্য বলছেআমি উঠে দাড়ালামনৌকার শেষমাথায় টর্চলাইট মেরে দেখি বৃদ্ধটি লাশের একটি পা ধরে পা'র মাংস খাচ্ছেপায়ের হারটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিবৃদ্ধটির মুখে আলো পড়তেই আমার দিকে তাকিয়ে রইলোচোখ থেকে নীলআলো বিচ্ছুরিত হচ্ছেমুখে রক্তের দাগের মত এ্যাবরো-থেবরো মাংস লেপটানোবিবৎস দৃশ্যখুব বমি আসতে লাগলআমি জোড়করে চেষ্টা করছি সবকিছু আটকিয়ে রাখতেতীরের দিকে তাকালামবুঝতে পারছি এতটুকু সাতার দিয়ে পার হওয়া আমার পক্ষে সম্ভবনাসবাইকে দেখলাম চিৎকার করছে আর দৌড়াচ্ছেআমি বৃদ্ধের দিকে টর্চলাইট মেরে দাড়িয়ে রইলামবৃদ্ধটি আমার দিকে তাকালো...... উঠে দাড়ালো.....ঝপাৎ
যতক্ষণ পারলাম সাতার কাটতেই থাকলামশেষে মাটি হাটুতে বাজলবুঝতে পারলাম তীরে এসে পৌছেছিদৌড় লাগালামচিৎকার অনুসরণ করে কাশবনের ভিতর দিয়ে দৌড়াতে লাগলামহাজার-হাজার মানুষের চিৎকারচারদিকে মশাল আর মশালকেউ কেউ ডাকাত ডাকাত করেও চিল্লাচ্ছেকাশবনের ঐ পাশেই একটা বাড়ী আছে সেখানে সবাই পরে রইলোআমিও গিয়ে ঐ খানে শুয়ে পড়লামচারদিকে মানুষ ঘিরে ধরেছেকেউ কেউ আমার কাছে ঘটনা জানতে চাইলো....আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিলনাএর মাঝে একজন সবাইকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিলসবার মাথায় পানি ঢালার ব্যাবস্থা করতে বললমামার হুশ হওয়ার পর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল- ভাইগ্না বাইচ্যা আছ? আপা আমারে মাইরাই ফালতোএকে একে সবাই হুশ হলোআমি সব ঘটনা খুলে বললামএর মাঝে দেখি শরীফের আব্বাও লোক নিয়ে হাজিরকেউ কেউ নদীর পাড়ে যাওয়ার সাহস দেখালোশেষে আমি সবাইকে নিয়া নদীর পাড়ে গেলামনৌকা নাইআমরা স্রোতের অনুকুলে হেটে যাচ্ছিসবাই চিৎকার করে উঠল এই যে নৌকাদেখলাম শুধু কংকালটা আছেএর মাঝে একজন বলল দেখিতো মাটিতে রাক্ষসটার পায়ের দাগ আছে কিনা? আমরা নদীর পাড়ে কোন পায়ের দাগও পাইনি
শেষে ঐ কংকালটিই মাটি দেওয়া হলো

ভয়ঙ্কর মৃত্যুর রহস্য

আমি তখন মেডিকেল কলেজের ফিফ্থ ইয়ার এর ছাত্রী। ঢাকায় বাসা হবার কারনে অন্য সব ছাত্রীদের মত আমাকেও মেডিকেল কলেজের হলে থাকতে হত। সেদিন ইভিনিং শিফ্ট সেরে হলে ফিরতে অনেক রাত হয়েছিল বলে তাড়াহূড়ো করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম আর প্রায় সাথে সাথেই ঘুম এসে গেল। ঘুমের মাঝে স্বপ্নে দেখলাম কলেজের মর্গে লাশ কাঁটার বিছানায় আমি শুয়ে আছি আর ফরেনসিক বিভাগের এক ডাক্তার একে একে আমার পড়নের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলছেন। বুঝলাম আমি তখনও জীবিত, কিন্তু সবাই ভাবছে আমি মরে গেছি আর তাই পোস্টমর্টেমের জন্য আমাকে এখানে রাখা হয়েছে। আমি তখন হাত পা নাড়তে কিংবা কোন শব্দ করতে পারছিলাম না, শুধু বুঝতে পারছিলাম ডাক্তার এখন আমার পোস্টমর্টেম না করে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। আমাকে সম্পূর্ণ নগ্নকরে কাপড় গুলা দূরে একটি বিছানায় সরিয়ে রাখলেন তিনি। তারপর ডাক্তার আমার দিকে এগুতেই হঠাৎ আমার মোবাইলের পরিচিত রিং-টোন শুনতে পেলাম। বুঝলাম বিছানায় রাখা আমার কাপড়ের ভিতর থেকে মোবাইল ফোন বাঁজছে। রিং এর আওয়াজ ক্রমেই বেড়ে চলেছে আর ডাক্তার ক্রমশ এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। হঠাত মনে হল এটা একটা দুঃস্বপ্ন। তাই প্রাণপনে ঘুম ভাংগার চেষ্টা করলাম আর এক সময় ঘুম ভেংগে গেল। ঘুম ভাংগার পর দেখলাম সত্যি আমার মোবাইলে রিং হচ্ছে। মনে মনে কলার কে ধন্যবাদ দিলাম, কারন তিনি ফোন না করলে ঘুমের মাঝে আরো কত কি হত কে জানে!
-হ্যালো
-ভাল আছ এষা?
-হ্যাঁ। কে বলছেন?
-কেন চিনতে পারছ না?
-না। কে হাসান ভাই
নাকি?
-না হাসান না।
-তাহলে কে?
-তুমি এখন
কি পড়ে আছ এষা?
স্কার্ট না সালোয়ার
কামিজ?
-থাপড়ায় গালের দাঁত ফেলে দিব হারামীর বাচ্চা।
এই বলে ফোন রেখে দিয়ে কলারের নাম্বার চেক করলাম। অপরিচিত নাম্বার, মোবাইলে সেইভ করা ছিল না। ব্যাটা জানত যে আমি ঘুমাচ্ছি, তাই ফোন ধরার আগে নাম্বার চেক করব না। তাই পরিচিত মানুষের মত কথা বলার চেষ্টা করছিল। হঠাত মনে হল আমিই বা হাসান ভাই নাকি জিজ্ঞেস করলাম কেন? হাসান ভাই ত মারা গেছেন অনেকদিন হল। রাগ নামিয়ে আবার ঘুমাবার চেষ্টা করলাম। রাত তখন
ক’টা বাজে জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল, কিন্তু মোবাইলের আলো চোখে লাগবে বলে আর সময় দেখলাম না। এর কিছুক্ষন পর আবারফোন বেঁজে উঠল।বুঝতে পারলাম ওই বদমাশ লোকটা আবার ফোন করেছে। তাই কল রিসিভ করলাম না। ফোন বন্ধ করে ঘুমাবার চেষ্টা করলাম আর হঠাত লোড শেডিং শুরু হল। এখন যে আর গরমে ঘুম আসবে না তা পুরোপুরি নিশ্চিত। তবু গরমে হাসফাস করতে করতে ঘুমাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন কাজ হল না। পাশের খাঁটের দুই রুমমেট তখন রুমে ছিল না। বোধহয় ওদের আজ
নাইট ডিউটি। থাকলে নাহয় ওদের সাথে গল্প করে সময় পার করা যেত। অনেক্ষন অপেক্ষার
পরও ইলেকট্রিসিটি না আসায় মনে হল এভাবে কষ্ট করে শুয়ে থাকার কোন মানে হয় না। ছাঁদে গিয়ে বসে থাকি, তাতে গরম কিছুটা হলেও কম লাগবে। মোবাইল অন করে মোবাইলের আলোয় পথ দেখে ছাঁদে চলে এলাম।
ছাঁদে আসার পর আবার মোবাইল বাঁজতে শুরু করল। এবার কল না কেঁটে বদমাশটা কে কিছু শক্ত
কথা শুনিয়ে দেবার কথা ভাবলাম। তা না হলে ব্যাটা হয়ত কালও আবার ফোন করবে। তাই ফোন ধরে ধমকের সুরে বললাম,
-হ্যালো কে আপনি?
-আমি অনেক দূর থেকে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি এষা। প্লিজ আমায় ভুল বুঝো না।
-আপনি কে সেটা কি বলবেন? নাহলে আমি ফোন রেখে দিব।
-আমি হাসান।
-আপনি হাসান ভাই না আমি জানি। কারন হাসান ভাই মারা গেছেন। আপনি কে সত্যি করে বলুন।
-সত্যি এষা আমি হাসান। আমি এখন ছাঁদে তোমার কাছে এলে কি তুমি আমায় বিশ্বাস করবে? একথা শুনার পর আর কথা বাড়ানোর সাহস রইল না। বুঝতে পারলাম লোকটা আশে পাশের
কোন বিল্ডিং থেকে আমাকে দেখতে পাচ্ছে। তাই কল কেটে দিলাম।
প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হল। কিছুদিন আগেই মোবাইলের সিম পাল্টেছি। এরই মাঝে হয়ত ক্লাসের
কারো কাছ থেকে নাম্বারটা কেউ পেয়ে গেছে। অথবা ক্লাসের কেউই আমাকে ফোন করে পরীক্ষা করছে। আমি তাঁর কথায় সাড়া দিলে হয়ত কথা রেকর্ড করে ক্লাসের সবার কাছে তা কোনভাবে পৌছে দিবে আর
আমাকে খারাপ সাজাবার চেষ্টা করবে। এ অবস্থায় আর ছাঁদে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না, কারন লোকটা আমায় ঘুমাবার পোশাকে দেখতে পাচ্ছে। তবে অন্ধকার থাকায় তা নিয়ে আমি খুব একটা শঙ্কিত হলাম না। আমি তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভিতর আশে পাশের বিল্ডিং গুলার দিকে তাকিয়ে কিছু বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন লাভ হলো না। তাই রুমে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। মোবাইলের
আলো জ্বেলে ছাঁদের দরজার দিকে এগুতে যাব আর ঠিক তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম কে যেন আমার কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে উঠল, এষা যেয়ো না দাঁড়াও। আমি আসছি। একথা শুনার পর প্রচন্ড ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাবার মত অবস্থা হল। মনে হল যেন ছাঁদে আমি ছাড়া আর অন্য কেউও আছে। ভয়ে আমি তখন মারা যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম ছাঁদে যে আছে সে যদি মানুষ হয় তাহলে হয়ত আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। আর যদি সেটা অন্য কিছু হয় তাহলে যেন সেটা আমার চোখের সামনে না আসে, কারন আমি সেই ভংকর দৃশ্য সহ্য করতে পারব না।
কিছু বুঝে উঠবার আগেই আরো একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাত কোথা থেকে যেন একটা আলোর ঝলকানি এসে ছাঁদের মেঝেতে পড়ল আর আমি দেখতে পেলাম মেঝেতে একটা কালো ছাঁয়া মূর্তি বসে আসে ছায়ামূর্তিটার মানুষের মত হাত পা আছে কিন্তু শরীরের গঠন মানুষের মত নয়। আমায় দেখতে পেয়ে ছায়ামূর্তিটা দ্রুত পানির ট্যাংকির দিকে হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেল আর ধীরে ধীরে পানির ট্যাংকির দেয়ালে মিশে যেতে শুরু করল। এর পরে কি হয়েছিল আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। সম্ভবত আমি সেখানেই জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে পাবার পর জানতে পারি আমি প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম আর চিৎকার করে মা’কে ডাকছিলাম। আমার চিৎকার শুনে নিচ থেকে ছাত্রীরা ছুটে এসে আমাকে রুমে নিয়ে যায়। মেডিকেলের ছাত্রী হিসেবে ভূত প্রেতে বিশ্বাস করাটা আমার মোটেই শোভা পায় না। তবুও আমি পরবর্তীতে এই ঘটনার কোন ব্যাখ্যা দাড় করাতে পারিনি। জানিনা হাসান ভাই কি সত্যি সত্যি সেদিন আমাকে স্বপ্নের ওই ডাক্তারের হাত থেকে বাঁচাতে এসেছিলেন কিনা। কারন সেই স্বপ্ন আমি এর আগেও বেশ কয়েকবার দেখেছিলাম। এই স্বপ্নের পিছনে একটা কারনও আছে, তবে সেই কারনের সাথে এই ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই বলে তা উল্লেখ করছি না। এষা ময়মনসিংহ চিঠিটি পড়ার পর এষাকে ফোন করলেন সিদ্দিকুর রহমান।
-হ্যালো স্লামালাইকুম
-মিস্ এষা বলছেন?
-জ্বী। কে বলছেন প্লিজ?
-আমি মাসিক হরর পত্রিকার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান ।
-ও আচ্ছা। আমার লেখাটা কি ছাঁপানো হচ্ছে?
-জ্বী। তবে তাঁর আগে আপনার আরো সাহায্যের প্রয়োজন।
-বলুন আমি কি করতে পারি?
-আপনি বোধহয় জানেন আমাদের চিঠিপত্র বিভাগে এ ধরনের লেখার সাথে সম্পাদকের দাড় করানো একটা ব্যাখ্যা থাকে। আর সেটার জন্য আপনার সাহায্যের প্রয়োজন।
-আমাকে কি আপনাদের অফিসে আসতে হবে?
-যদি আসতে পারেন তাহলে খুবই ভাল হয়। আর নাহলে ফোনেই কাজটা সেরে নেয়া যাবে। কখন ফোন
করলে আপনার সাথে সময় নিয়ে কথা বলা যাবে?
-আমি আসলে এখন একটু ব্যাস্ত আছি। আপনি চাইলে আমি নিজেই কাল আপনাকে ফোন করব অথবা আপনাদের অফিসে এসে দেখা করে যাব।
-আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
-আপনাকেও। ভাল থাকবেন।
ফোন রাখার পর সিদ্দিকুর রহমান তাঁর রহস্য ডায়েরীর একটি খালি পাতা খুলে বসলেন। সেখানে দ্রুত কিছু নোট লিখে ফেললেনঃ
১) হাসান সাহেব কে?
প্রথমে যেই লোকটি টেলিফোন করেছিল তাঁর গলার স্বর কি হাসান সাহেবের মত ছিল?
ধরে নেয়া যাক হ্যাঁ।
আর সে কারনেই এষা তাকে প্রথমে হাসান সাহেব মনে করেছিল। কিন্তু এষা কেন ফোনে হঠাত একজন মৃত মানুষের কথা স্মরণ করবে?
তাহলে কি হাসান সাহেব এষার খুব কাছের কেউ ছিলেন যাকে এষা এখনো প্রত্যাশা করে?
সেই তীব্র প্রত্যাশা থেকে কি এষা মনে করে হাসান ভাই তাঁর কাছে এসেছিল তাঁকে সেই ফরেনসিক
বিভাগের ডাক্তারের হাঁত থেকে রক্ষা করার জন্যে? আর তাই সে সাধারন একটা ব্ল্যাংক কল কে হাসান সাহেবের কল মনে করে অনেক কিছু ভেবে বসে? হতে পারে হাসান সাহেবের মৃত্যুর সময় এষা তাঁর কাছে ছিল না, তাই তাঁর অবচেতন মন সব সময় চাইত হাসান সাহেবের সাথে শেষ আরেকটিবার দেখা করতে? কিন্তু মৃত মানুষের কোনভাবেই ফিরে আসা সম্ভব না বলে তাঁর অবচেতন মন সেই ইচ্ছা নিয়ে হতাশায় ভুগছিল। তাই সেদিন সেই স্বপ্ন আর ব্ল্যাংকল এর সাথে কোন সংযোগ ঘটিয়ে তাঁর অবচেতন মন সাধারন কোন ছাঁয়া কে হাসান সাহেবের ছাঁয়ামূর্তিতে রুপান্তর করে? যদি তাই হয় তাহলে এই ঘটনার প্রভাবক হিসেবে অন্য কোন ঘটনা কাজ করেছে যা এষা তখন খেয়াল করেনি। সেই না জানা ঘটনা কে বের করতে পারলেই অনেক রহস্য বেরিয়ে আসবে।
২) এষা লিখেছে কেউ তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলেছিল এবং সে তা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল। এই স্পষ্ট শুনতে পাবার ঘটনাই হাসান সাহেবের ছাঁয়ামূর্তির ঘটনার প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়াও আরেকটি কারন এই ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বকে জোড়ালো করতে পারে। এষা লিখেছে তাঁর তখন দুই ধরনের ভয় হচ্ছিল। প্রথমত ছাঁদে যা ছিল তা যদি মানুষ হয় তাহলে তাঁর বড় কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত
সেটা যদি মানুষ না হয় তাহলে সে প্রচন্ড ভয় পাবে। একজন মেডিকেলের ছাত্রী হিসবে এষা কখনো ভূত প্রেত বিশ্বাস করত না। তাই লোকলজ্জার ভয়ে তাঁর জাগ্রত মন চাচ্ছিল এটা যেন কোন মানুষ না হয়, কারন এষা জানে ভূত বলে কিছু নেই, আর এটা মানুষ না হলে ভূত হবারও সম্ভাবনা নেই, হয়ত মনের ভুল হতে পারে যা ভাল করে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে। অপরদিকে এষার অবচেতন মন প্রচন্ডভাবে হাসান
ভাই কে প্রত্যাশা করছিল। সেই ভয়ংকর মূহুর্তে এষার চেতন ও অবচেতন দু’টা মনের ইচ্ছাই এক হবার
কারনে এষা ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বকে বিশ্বাস করেছিল। ঘটনার ব্যাখ্যা দাড় করাতে অবশ্যই আমাদের কোন অলৌকিক ঘটনা কে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। তাহলে এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এষার কানে কে ফিস ফিস করে কথা বলেছিল? আশেপাশে যদি কেউ না থাকে তাহলে একমাত্র মোবাইল ফোনেই সে কথা শুনতে পাবে। কিন্তু এষা তখন কলারের সাথে কথা বলছিল না। তাই মোবাইলে সে ফিস ফিস কন্ঠটি শুনেনি।
আবার এষা লিখেছে সে মোবাইলের আলোয় পথ দেখে ছাঁদের দরজার দিকে এগুচ্ছিল। তাহলে কি হতে পারে সে যখন মোবাইলে আলো জ্বালবার জন্য মোবাইলের বোতামে চাপ দেয় তখন সেই কলারের কল
রিসিভ হয়ে যায় আর সেই কলার কাছের কোন বিল্ডিং থেকে এষাকে ছাঁদের দরজার দিকে না যেতে বলে? আর মোবাইলের সে কথাই এষার কানের কাছে ফিস ফিস করে কথা বলার মত মনে হয় কারন সে জানত না সে ভুলে কল রিসিভ করে ফেলেছে? এই ব্যাখ্যা যুক্তি সংগত।
৩) এখন ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বকে মিথ্যা প্রমাণ করতে হলে যে কারনটি দাড় করানো যেতে পারে তা হল এষা যা দেখেছিল তা ঘুমের ঘোরে দেখেছিল। অর্থাৎ, এষা লিখেছে ছাঁদে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল
কারন লোডশেডিং হচ্ছিল। কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোন ছাঁয়ামূর্তি দেখা সম্ভব নয়। তাহলে এষা আরো আগেই অন্য কোন কারনে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু জ্ঞান ফিরে পাবার পর সেই ভয়ের কারন তাঁর মনে থাকে না বরং অজ্ঞান থাকাকালীন সময়ে স্বপ্নে যেই ছাঁয়ামূর্তি দেখতে পায় তাকেই সে সত্যিকার ছাঁয়ামূর্তি বলে মনে করেছিল।
এবার ধরা যাক
এষা সত্যি ছাঁয়ামূর্তি দেখার পর জ্ঞান হারিয়েছিল।আর যদি এষা সত্যি ছাঁয়ামূর্তি দেখে জ্ঞান হারায় তাহলে অবশ্যই সেই সময় কিছুটা হলেও আলো ছিল। এষার মতে ছাঁয়ামূর্তিটা এসেছিল একটা আলোর
ঝলকানির মাধ্যমে। তাহলে কি ধরে নেয়া যায় তখন হঠাত ইলিকট্রিসিটি চলে আসে বলে আসে পাশের বাড়িগুলা তে আলো জ্বলে উঠে আর এষা সেই আলোকেই আলোর ঝলকানি মনে করে? এই ঘটনা কে সাহায্য করতে আরেকটি ঘটনার বাস্তব রুপান্তর প্রয়োজন। এষা কেন ইলিক্ট্রিসিটি ফিরে আসা খেয়াল করবে না?
হতে পারে সে ইলেক্ট্রিসিটি ফিরে আসার সময় প্রচন্ড ভয় পেয়েছিল অর্থাৎ ছাঁয়ামূর্তিটাকে দেখেছিল?
আর যদি ছাঁয়ামূর্তিটা কে দেখেই থাকে তাহলে সেই ছাঁয়ামূর্তিটা এষার কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল কেন? হতে পারে এষার কাছের বিল্ডিং থেকে যেই মানুষ টা এষার সাথে কথা বলছিল হঠাত
ইলেকট্রিসিটি চলে আসবার কারনে সে দ্রুত জানালা থেকে সরে যায় আর তাঁর ছাঁয়া ধীরে ধীরে দেয়ালে মিলিয়ে যায়? কিন্তু এষা লিখেছে ছাঁয়ামূর্তির মানুষের মত হাত পা ছিল কিন্তু শরীরের গঠন মানুষের
মত না। শরীরের গঠন মানুষের মত না বলতে সে কি বুঝিয়েছে? ছাঁয়ামূর্তিটিকে যদি তাঁর অবচেতন মন নিয়ে আসে তাহলে সেই অবচেতন মন তাঁর শরীরের গঠন মানুষের মত করে কেন আনল না? আর সে যদি কোন মানুষের সাধারন ছাঁয়া দেখেও ভয় পায় তাহলেই বা সেই ছাঁয়ার শরীর মানুষের মত ছিল না কেন? এখানেই যুক্তি কাজ করছে না। তাই ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্ব সত্যি কি মিথ্যা তা মোবাইলে ফিস ফিস কন্ঠ শুনবার মত সহজে প্রমাণ করা গেল না।
৪) ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তার কে?
এষা কেনই বা এধরনের স্বপ্ন আগে দেখত? তা একমাত্র এষার সাথে কথা বলেই জানা যাবে।
৫) উপরের কোন যুক্তিই কাজ করবে না যদি হাসান সাহেব এষার খুব কাছের মানুষ না হয়ে থাকেন। অর্থাৎ এষার অবচেতন মন যদি হাসান সাহেব এর দেখা পেতে না চায়। কিন্তু তা হবার সম্ভাবনা কম কারন এষা চিঠির শেষে লিখেছে যে হাসান সাহেব কি সত্যি এষা কে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার এর
হাত থেকে রক্ষা করতে এসেছিল কিনা তা সে জানে না। খুব কাছের মানুষ না হলে দূরের কাউকে এভাবে ছুটে আসার কথা এষা কখনো চিন্তা করবে না। আর এসব কারনেই এষার সাথে কথা বলে আরো কিছু তথ্য জানতে হবে, যা রহস্য সমাধানে সাহায্য করবে। আপাতত শুধু একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে যে এষা আসলে মোবাইলে সেই কলারের ফিস্ ফিস্ কন্ঠ শুনেছিল। এই সূত্র ধরেই সামনে এগুতে হবে। এখন এষাকে যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
করতে হবে তা হলঃ
১) হাসান সাহেব কে ছিলেন?
২) জ্ঞান ফিরে পাবার পর এষা মোবাইলে সেই কলারের কল কতবার রিসিভ করেছিল সেটা কি চেক করেছিল ? দু’বার না তিনবার?
৩) সেই কলারের নাম্বার নিশ্চয়ই এষা মোবাইল থেকে সংগ্রহ করে রেখেছিল? সেই নাম্বারে কি পরে কখনো ফোন করা হয়েছিল কলারের সন্ধান জানতে?
৪) ছায়াঁমূর্তির শরীরের গঠন তাঁর কাছে মানুষের মত মনে হয়নি কেন?
৫) ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তার কে? এর পরদিন সিদ্দিকুর রহমান এষার সাথে ফোনে কথোপকথোন সেরে নিলেন এবং মূল পাঁচটি প্রশ্নের জবাব তাঁর ডায়েরীতে লিখে রাখলেনঃ
১) হাসান সাহেব এষার মেডিকেল কলেজের সিনিয়র স্টুডেন্ট ছিলেন। এষার সাথে তাঁর বিয়ে হবার কথা ছিল। হাসান সাহেব এম,বি,বি,এস শেষ করে লন্ডনে চলে যান লেখাপড়ার জন্য কিন্তু লন্ডনে একটা রোড
এক্সিডেন্টে তিনি মারা যান দু’বছর আগে। হাসান সাহেবের সাথে এষার সম্পর্ক খুব বেশিদিনের ছিল
না বলে এষা হাসান সাহেবের পরিবার এর ঠিকানা জানত না। তাই হাসান সাহেবের মৃত্যুর সংবাদটি পায় হাসান সাহেবের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে।
২) কল কতবার রিসিভ করা হয়েছিল কিংবা কলারের নাম্বার কি ছিল তা এষা জানতে পারেনি,কারন তাঁর মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। সে যখন চিৎকার করে জ্ঞান হারায় তখন তাঁর চিৎকার শুনে হলের
ছাত্রীরা ছুটে এসে তাকে রুমে নিয়ে যায়, আর পরবর্তীতে কেউ তাঁর ফোনটি সরিয়ে ফেলে।
৩) তিন নম্বর মন্তব্য অনুযায়ী -জানা যায় নি।
৪)এষা বলতে চাচ্ছে ছাঁয়ামূর্তির বুক থেকে কোমরের দিকটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের চওড়া অর্থাৎ তাঁর
শরীরের অনুপাত কখনোই মানুষের মত ছিল না। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল যে ছাঁয়ামূর্তির
দুপাশে দু’টি পাখা ছিল। এই পাখার কারনেই সে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিল যে এটা কোন মানুষের ছাঁয়া নয়।
৫) ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তার এষা কে পছন্দ করতেন। হাসান সাহেবের মৃত্যুর পর এষার সাথে তাঁর কিছুটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। পরবর্তীতে অনেক রোগীর অভিযোগে সেই ডাক্তারের নামে একটা স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়লে এষা সেই সম্পর্ক কে আর এগুতে দেয়না। কিন্তু ডাক্তার তারপরও এষাকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে যায়। এর প্রায় পনের দিন পর
‘মাসিক হরর’
পত্রিকায় সম্পাদকের ব্যাখ্যা সহ এষার চিঠিটি ছাঁপা হয়।
সম্পাদকের ব্যাখ্যার
খানিকটা অংশঃ
…………লন্ডনে হাসান সাহেবের একটা রোড এক্সিডেন্ট হয় ঠিকই কিন্তু তিনি তাতে মারা যান না। বেঁচে গেলেও তিনি শারীরিকভাবে পংগু হয়ে যান এবং হুইল চেয়ার ব্যাবহার করতে শুরু করেন।
এমতাবস্থায় তিনি এষা ও তাঁর পরিবারের কথা চিন্তা করে এষা কে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন।কারন এই পংগুত্বকে এষা সহজভাবে নিলেও এষার পরিবার হয়ত সার্বিকভাবে এই বিয়েতে খুশী থাকবে না,
তাছাড়া তিনিও চান না তাঁর ভালবাসার মানুষটি সারাজীবন একজন হুইলচেয়ারে বসে থাকা মানুষের
সাথে ঘর করুক। তাই তিনি তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে এষাকে তাঁর মৃত্যুর খবরটি পৌছে দিয়েছিলেন। হাসান সাহেবের বাবা মা গ্রামে থাকতেন বলে এষাও পরে আর তাঁর বাবা মা’র সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। লন্ডন থেকে ডিগ্রী নিয়ে হাসান সাহেব তখন দেশে ফিরে এসেছিলেন। সম্ভবত অল্প কিছুদিন পর তিনি আবার লন্ডন ফিরে যেতেন কারন ফোনে তিনি বলেছিলেন তিনি অনেক দূর থেকে এষার সাথে দেখা করতে এসেছেন। এষা যেন জানতে না পারে তাই তিনি এষার হোস্টেলের পাশের একটি বাড়িতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্যে। হাসান সাহেব যেহেতু একই মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন তাই তাঁর জন্য এ কাজটি করা খুব একটা অসুবিধের কিছু ছিল না। তিনি কিছুদিন এষা কে লুকিয়ে লুকিয়ে সেই বাড়ী থেকে দেখে চোখ জুড়াতেন। কখনো ভাবেন নি এষার সামনে তিনি যাবেন। এষা সাধারনত বিকেলের মধ্যে হলে ফিরে আসে, কিন্তু সেদিন এসেছিল অনেক রাত করে। তাই তিনি এষাকে দেখতে পাননি। আর এই না দেখার কষ্ট তাকে এষাকে ফোন করতে বাধ্য করে, কারন হয়ত পরদিনই
তিনি দেশে ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবছিলেন। ফোন ধরার পর এষা যখন জিজ্ঞেস করে কে ফোন করেছে তখন তিনি ভুল করে বলে ফেলেন ‘কেন চিনতে পারছ না?’ এর জবাবে এষা হাসান সাহেবের কন্ঠ
চিনে ফেললে তিনি তা অস্বীকার করেন আর তাঁর মিথ্যা কে আরো জোড়ালো করার জন্য তিনি ইচ্ছে করে এষাকে অশ্লীল একটা প্রশ্ন করেন বসেন, যেন এষা এটা কে একটা ব্ল্যাংক কল হিসেবে মনে করে। এষার অবচেতন মন সব সময়…………………
এষাকে ছাঁদে দেখে হাসান সাহেব প্রচন্ডভাবে এষার সাথে কথা বলতে ইচ্ছাপোষন করেন।তখন ছিল
গভীর রাত। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে মানুষের আবেগ অনেক সময় প্রবণ হয়ে উঠে এবং তা অনেক কিছু মানতে চায় না। তাই এই পর্যায়ে তিনি এষার সাথে দেখা করে সব কিছু খুলে বলতে চেয়েছিলেন। সেই সময় হঠাত ইলেকট্রিসিটি চলে আসে আর এষা হুইল চেয়ারে বসা হাসান সাহেবের ছাঁয়া ছাঁদের মেঝেতে দেখতে পায়। এষা যে হাসান সাহেবের ছাঁয়া দেখতে পেয়েছে তা তিনি বুঝতে পারেন
এবং সেকারনে দ্রুত তিনি জানালা থেকে সরে যান।
এখন প্রশ্ন
থাকতে পারে হাসান সাহেব ত এষার সাথে দেখা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাহলে তিনি কেন দ্রুত সরে গেলেন? হতে পারে ইলেকট্রিসিটি চলে আসার পর তিনি এষাকে ছাঁদে আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন আর তখন তিনি মত পাল্টান।চারদিকের আলো তাঁর আবেগ কে দমন করতে সাহায্য করে।
অথবা এমনো হতে পারে এষাকে শোবার পোষাকে দেখে ফেলায় এষা লজ্জিত হতে পারে বলে তিনি পাশের বাড়িতে থাকবার বিষয়টি গোপন করতে চেয়েছিলেন। এষাকে ফোন করা থেকে শুরু করে এষার জ্ঞান হারানো পর্যন্ত যা কিছু হয়েছিল তার সব কিছুর মূলে রয়েছে হাসান সাহেবের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ। আর সেই আবেগ হাসান সাহেবকে অনেক যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা দ্রূত সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছিল। তিনি যখন হুইল চেয়ারে করে জানালা থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছিলেন তখন এষা তাঁর হুইল চেয়ারের ছাঁয়াকে ছাঁয়ামূর্তিটির পাখা ভেবে ভুল করে। আর তখনই এষা নিশ্চিত হয়ে যায় এটা কোন মানুষের ছাঁয়া নয়। হাসান সাহেবের হুইল চেয়ারে করে দ্রুত সরে যাবার ঘটনা কে এষা ছাঁয়ামূর্তির হামাগুড়ি দিয়ে দূরে সরে যাওয়া মনে করে…………
ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তারের সাথে এষার কিছুটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আর পরবর্তীতে তা এগুতে পারেনি ডাক্তারের স্ক্যান্ডালের কারনে ( সম্ভবত স্ক্যান্ডালটি নারীঘটিত কোন ব্যাপার ছিল )। তাই সেই সব মিলিয়ে এষা প্রায় সেই ডাক্তার কে নিয়ে এধরনের স্বপ্ন দেখত। সেদিন হাসান সাহেবের ফোনের রিং এ এষার কাঁচা ঘুম ভেংগে যায় আর ফোন ধরে সে হাসান সাহেবের কন্ঠ শুনতে পায়। হাসান সাহেবের পরিচিত কন্ঠ ও সেই স্বপ্ন এষার অবচেতন মনকে হাসান সাহেবের ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে সাহায্য করে আর এষা তখন ভয়ে জ্ঞান হারায়। আমার এই ব্যাখ্যা শুধুমাত্র এষার সাথে কথোপকথোনের
মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ব্যাখ্যা তখনই গ্রহনযোগ্য হবে যদি হাসান সাহেব মারা না যান। তা জানা সম্ভব নয় কারন হাসান সাহেবের একমাত্র বন্ধু যাকে এষা চিনত তিনি কিছুদিন আগে মারা যান। এছাড়াও মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রি অফিস থেকে হাসান সাহেবের গ্রামের ঠিকানা সংগ্রহ করতে চাইলে খুবই অদ্ভুতভাবে হাসান সাহেবের ঠিকানার পাতাটি ছেঁড়া পাওয়া যায়। তবে এষার বর্ণিত ছাঁয়ামূর্তির সাথে প্রাচীন গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীর পাখাওয়ালা শয়তানের মিল পাওয়া যায়। কাহিনীর
বর্ণনা অনুযায়ী শয়তান অমাবশ্যার রাতে প্রজননের জন্য মৃত আত্মার উপর ভর করে কুমারী মায়েদের
সাথে মিলনের মাধ্যমে নতুন শয়তানের জন্ম দেয়। আর তার জন্য অবশ্যই পরিচিত মানুষের বেশ ধরা প্রয়োজন। হতে পারে এষার গর্ভে তখন ওই ডাক্তারের সন্তান ছিল যা সে সবসময় গোপন করে চলেছে এবং তাই সে লেখাতেও স্বপ্নের কারন উল্লেখ করেনি। হয়ত আমার কাছে সেই পৌরাণিক কাহিনীর শয়তানের কথা শুনে এষা নিজেই রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করে হাসান সাহেবের ঠিকানার পাতাটি ছিঁড়ে ফেলে, কেননা হাসান সাহেবের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটিত হলে হয়ত নতুন কোন অজানা তথ্য
বেরিয়ে আসবে যা এষা কাউকে জানতে দিতে চায় না।

(সংগ্রহীত গল্প)

অতৃপ্ত নারী (ভূতের গল্প)


বিকেল বেলা আকাশটা খুব পরিস্কার ছিল। আকাশে ছিটে ফোটা মেঘও ভাসতে দেখিনি। লাল হতে হতে সূর্যটা যখন বিদায় নিলো তখনো ছিল মেঘ মুক্ত স্বচ্ছ আকাশ। আমার ঘরে বিদুৎ নেই মাস খানেক যাবৎ। বিদুৎ অফিসের লোকজন মিটার খুলে নিয়ে গিয়েছে। তাদের দাবী আমি নাকি গত পাঁচ মাস বিদুৎ বিল দিচ্ছি না। তাদের এতো করে বললাম যে আমার কাজের ছেলে হানিফ মিয়া প্রতি মাসে বিল দিয়েছে, তারা আমার কথা বিশ্বাস করলো না। বাধ্য হয়ে হানিফ কে ডাকলাম। অবাক কান্ড হানিফকে কোথাও খুজে পেলাম না। অথচ গত চার বছর সে আমার কাছে ছিল।
হানিফের বিস্থতা প্রশ্নাতিত ছিল। সে কি শুধু বিদুৎ বিল মেরেছে নাকি আরো কিছু করেছে?
ডজন খানেক মোমবাতি কিনে ছিলাম। সাথে হারিকেন আর কেরোসিন তেল। মোমবাতি শেষ, তাই হারিকেনের লাল আবছা আলোয় বসে তিন দিনের বাসি পেপার পড়ছি।
অজপাড়া গা না হলেও এই গ্রামটা থানা সদর থেকে অনেক দুরে। রাস্তা ঘাট তেমন সুবিধের না। কাচা মাটির রাস্তার উপর ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়ে ছিল। তবে সেই ইট এখন আর তেমন একটা নেই, আছে কেবল মাটি।
আমার বাবা কবি ছিলেন। তিনি শেষ জীবনটা গ্রামে কাটাবেন বলে এই সেমিপাকা বাড়িটা করে ছিলেন। কিন্তু তিনি শেষ জীবনটা কাটাতে পারেন নাই। কারন বাড়ির কাজ শেষ হবার আগেই তিনি এই বাড়িতে আসার পথে বাস দুঃর্ঘটনায় মারা যায়। তখন আমি স্কুলে দশম শ্রেনীতে পড়তাম। বাবার সরকারী চাকুরি ছিল। মা পেনশন আর জমানো টাকা দিয়ে আমাদের বড় করেন। আমরা তিন ভাই। সবাই ভাল চাকুরি করছি। ছোট দু’ভাই শহরে বেশ ভাল রোজগার করছে। তবে বাবার ইচ্ছে পুরন করার জন্য আমি এই গ্রামে পড়ে আছি। আমার শহরের বন্ধুরা আমাকে পাগল ভাবছে। ওদের ধারনা আমার মাথার স্কু ঢিলা আছে। তবে আমি স্কু নিয়ে ভাবছি না। আমার মায়ের ধারনা বাবার সব কিছু আমি পেয়েছি। সে আমাকে নিয়ে বেশ বিচলিত। তবে আমার খুব ভাল লাগছে এখানে থাকতে। আমি স্থানীয় কলেজের বাংলায় অধ্যাপনা করছি।
প্রতিদিন পুরো পত্রিকা পড়া আমার নেশা কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এখানে সঠিক সময় পত্রিকা পৌছায়না। পিয়নটাও বজ্জাত কখনো কখনো তিন চার দিনের পত্রিকা এক সাথে দিয়ে যায়।
দু’দিন পর আজ বিকেলে পিওন পত্রিকা দিয়ে গেল। বাসি পত্রিকাই মনোযোগ দিয়ে পড়তে ছিলাম, হটাৎ করেই ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো। ধপাস করে জানালার কবাট আছড়ে পড়ল। বিকট শব্দ হল। খোলা জানালা দিয়ে প্রবল বাতাস ঘরে ঢুকে সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে যেন। আমি দ্রুত জানালা বন্ধ করে ফেললাম। আশে পাশে কোথাও ব্যাপক শব্দে বাজ পড়ল। বিদুৎ চমকাচ্ছে খুব। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। আকাশে মেঘ জমার ফলে অন্ধকার এত গভির। আধার আমার ভাল লাগে। গভির রাতে আমি জানালা খুলে আধার দেখি। হানিফ অবশ্য আধার খুব ভয় পায়। ওর ধারনা এ বাড়িতে একটা মেয়ে ভুত আছে। যে সাদা শাড়ি পড়ে ঘুরে বেড়ায়। ভুতটার বয়স বেশি না। উনিষ কুড়ি বছর হবে। তবে সে ভয়ানক সুন্দরী। পুকুর ঘাটে প্রায়ই রাতে তাকে দেখা যায়। হানিফ ভুতের ভয়ে অস্থির!
আমি ছোট বেলায় মায়ের মুখে অনেক ভুতের গল্প শুনেছি। তাই হানিফের গল্প বেশ পরিচিত মনে হয়েছে। আমি জানি ভুত বলতে কিছু নেই। সবি দূর্বল চিত্তের মানুষের কল্পনা মাত্র।

হানিফ এই গল্প সারা গ্রাম ভরে শুনিয়েছে কিনা কে জানে? পরসু সন্ধায় চায়ের দোকানদার ফজুলু মিয়া আমাকে ডাকলো,কাছে যেতেই মোলায়েম স্বরে বললো
বাবাজি ভালো আছোনি?
জ্বি। ভালো।
বসো, চা খাও।
না চাচা, আমার হাতে সময় নেই।
এবার তিনি সিরিয়াস ভংঙ্গিতে বললেন, কি দরকার বাবা ঐ অভিশপ্ত বাড়িতে একলা পড়ে থাকার ! তুমি শহরের মানুষ তোমার কি এত বড় রিস্ক নেওয়া ঠিক হইতাছে? ভুত-প্রেত কি বাবা শিক্ষিত দেইখা তোমারে সুযোগ পাইলে ছাইড়া দিবো?
এ ব্যাপারে অন্যদিন কথা বলবো আজ আমার হাতে সময় নেই।
আমি মুচকি হেসে চলে আসায় ফজুলু কাকা বেশ আহত হল।ফজলু মিয়া খুব সুন্দর করে গল্প বলে, তার চায়ের দোকানের কাষ্টমার গণ খুব ভাল ¯্রােতা। ভুত-প্রেত নিয়ে তার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া দু একটা গল্প সে হয়ত আমাকে শুনাতে চেয়ে ছিল। কিন্তু বিকেল বেলা আমার কফি খাওয়ার নেশায় ধরে তাই তাকে রেখে চলে আসি। ফজলু মিয়া বিরবির করে কি যেন বললো। বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। কিন্তু পিছন ফিরে তাকাইনি।

পত্রিকা থেকে চোখ সরিয়ে আমার রুমে পূর্ব দিকের কোনায় তাকালাম। বাতাস প্রবেশের জন্য যে ফাঁকা জায়গা রয়েছে সেখানে একটা চড়–ই পাখি বাসা বেধেছে। পাখিটা প্রতিদিন আমার কাজ কর্ম মনোযোগ সহ লক্ষ করে। আজ চড়–ই পাখিটাকে দেখছি না। সে হয়ত তার কোন আতিœয়র বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। আচ্ছা পাখিদের কি আতিœয়র বাড়ি আছে? নাকি সেও ভুতের ভয়ে চলে গিয়েছে!
আমার বাবা বাড়িটা বেশ বড় করেই তৈরী করে ছিলেন। সামনে পুকুর ঘাট। আর উত্তরের দিকে ফুলের বাগান। দক্ষিনে ফাকা মাঠ। সুযোগ পেলে আমি মাঠে গিয়ে বসি। তেমনী গতকালও বসে ছিলাম। তখন মিজান এসে আমার সামনে দাড়ালো। মিজান এই গ্রামেরই ছেলে। বয়স ১৭ বছর হবে। সে কৃষি কাজ করে। আমি বললাম কি কেমন আছ মিজান? মিজান বললো আপনী অনেক সাহসী, না?
হেসে বললাম না, আমি একটা ভিতুর ডিম! মিজান বললো আমি অনেক দিন ধরে গরু চরাই কিন্তু আপনাদের মাঠে এত ঘাস থাকলেও গরু বাধতে পারি না। আমি অবাক হয়ে বলি কেন?
মিজান নিচু স্বরে বলে, যত বারই গরু বাধি এসে দেখি রশি ছিড়ে গরু পলাইছে। এমন কি আপনাগো বাড়ির সামনে দিয়ে গরু নিয়ে যাবার সময় গরু দৌড় দেয়!
আমি হেসে বললাম তোমার গরুর দৌড় দেয় কেন? ও অবাক হয়ে বললো কেন দেয় আপনী জানেন না? আমি মাথা দুলিয়ে বললাম নাতো? কেন দেয়?
ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো, আপনাদের বাড়িতে ভুত আছে। গরুরা ভুত দেখতে পায় তাই ওরা দৌড় দেয়।
আমি বললাম এমন আজব তথ্য তুমি কোথা হতে পেলে? ও আহত হয়ে বলে ,আমার দাদা বলেছে। দাদা ভুতের ওঝা সে সব জানে। তার দাদা ওঝা বলে মিজানের চোখে খুব অহংঙ্কার। কিন্তু আমি তার বা দাদার সর্ম্পকে কোন আগ্রহ না দেখানোয় সে খুব আহত হয়। আমার উপর রাগ করে চলে যায় মিজান। আমি ছেলেটার রেগে চলে যাওয়া দেখে ভাবি সত্যি পৃথীবিতে সবাই তাদের কাঙ্খিত মূল্যায়ন টুকু চায় না পেলে আহত হয়।
ধপ করে হারিকেন নিভে গেল। ভাবনায় ছেদ পড়ল। টেবিলের ড্রয়ারে আমি নিজ হাতে ম্যাচটা রেখেছি কিন্তু এখন খুজে পাচ্ছিনা। কালো অন্ধকারে চারপাশ ছেয়ে গিয়েছে। দু’চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। কে যেন আমার রুমে প্রবেশ করল। হাটা চলার শব্দ পাচ্ছি। পায়ের নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ শুনছি। কিন্তু কাউকে দেখছি না। বুকের ভেতর আচমকা শূন্যতা অনুভব করছি। ভয় লাগছে। ভীষন ভয় পাচ্ছি। কে যেন আমার কাধে হাত রাখল। ভয়ানক ঠান্ডা সেই হাত। ভাবছি দরজা খোলার শব্দ পেলাম না কিভাবে ঢুকলো আগন্তুক!!
হটাৎ করে কেউ একজন আমার কাধে হাত রাখলো ভয় পেয়ে আতকে উঠে বললাম, কে কে আপনি?। বেশ গম্ভীর স্বরে এক নারী কন্ঠ বলল

ভয় পেওনা আমি সুরভি। এই নাও তোমার দিয়াসলাই।

ম্যাচ দিয়ে দ্রƒত হারিকেন জ্বালালাম। আমার সামনের চেয়ারে সাদা সালোয়ার পড়া এক নারী বসে আছে। তার মুখটা মায়াবী। চোখের নিচে কালি জমেছে, তার ঠোট কাঁপছে। তার এই আচমকা ঘরে প্রবেশ দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে ছিলাম তবে এখন কিছুটা সাহষ পাচ্ছি। আমি সুরভির দিকে তাকিয়ে বললাম আপনী কি করে ঘরে ঢুকলেন? আমিতো ঝড়ের রাতে আপনাকে এভাবে আচমকা প্রবেশ করতে দেখে ভয় পেয়েছি। ভেবেছি আপনী একটা ভুত!



হাঃ হাঃ করে ঘর কাপিয়ে হেসে উঠল সুরভী। র্শ্লেষমাখা কন্ঠে বললো, তুমি ঠিকই ভেবেছো আমি একটা ভুত! কিন্তু আমি একটা ভাল মানুষ ছিলাম। একটা লক্ষি মেয়ে ছিলাম। আমার বুকে কত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আমি জীবনে কিছুই পেলাম না। ডুকরে কেদে উঠে নিজেকে ভুত দাবী করা সুরভী। আমার দিকে তাকিয়ে বলে তোর বাবা একটা খুনি! আমাকে মেরে ফেলেছে তোর বাবা বিখ্যাত কবি রশিদ আহম্মেদ।

কথা শেষ করে আমার দিকে ক্রোদ্ধভরা দৃষ্টিতে তাকায় সুরভী। ওর দৃষ্টি আগুনের মত আমার শরীরে বিদ্ধ হয়। হতবিহব্বল হয়ে পড়ি আমি। হৃদয়ে সুনামীর মত তোলপাড় শুরু হয়। কি বলছে এই নারী! পাগলের প্রলাব নয়তো? আমি শুধরে দেবার চেষ্টায় বললাম, দেখুন আমার বাবা ১৬ বছর হল মারা গিয়েছে। কেন তাকে নিয়ে এমন বাজে কথা বলছেন? কেন আমাকে আহত করছেন? আমার বাবা আমার জীবনের সব, তার দেখানো পথে চলছি আমি। সে আমার কাছে চাদেঁর মতই নিস্পাপ। এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে বুকটাকে হালকা করার চেষ্টা করি আমি।

সুরভীর কোন ভাবান্তর হয়না। সে তাকিয়ে আছে শূন্যে। তার চোখে জ্বল। হারিকেনের লাল আলোতে তার মুখটা ভারি মায়াবী মনে হয়। সুরভী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। আমার দিকে তাকিয়ে বলে তুমি কি তোমাদের বাড়ির পূর্ব দিকের কোনর ঘরটা কোন দিন খুলে দেখেছো?

না। ওটাতো বোধহয় ষ্টোর রুম।কোথাও চাবি পাইনী খুজে পাইনী। কেন?

শিতল গলায় সুরভী বলে ওখানে আমার কঙ্কাল ঝুলে আছে।

ভয়ে আমার শরীরের লোম দাড়িয়ে যায়। গলা শুকিয়ে যায় , কাপা গলায় বলি কি বলছেন? তা হবে কেন?

তোমার বাবা আমাকে ঐ রুমে তালাবদ্ধ করে রেখে ছিল।

কেন?

জানিনা তুমি বিশ্বাস করবে কি না তারপরও বলছি, তোমার বাবা যখন বদলী হয়ে আমাদের চট্রগ্রাম শহরে এল তখন সে আমাদের পাশের বাসা ভাড়া নিয়ে ছিল। একদিন কলেজে যাবার পথে তার সাথে পরিচয় হল। জানলাম সেই আমার প্রিয় কবি রশিদ আহম্মেদ। তার লেখা রোমান্টিক কবিতা গুলো ছিল অসাধারন! সে আমাকে তার স্বরচিত কবিতা আবৃতি করে শুনাতো। কিছুদিন তার সাথে চলার পর দেখলাম তার কবিতার চেয়েও সে বেশি অসাধারন। আমিই প্রথম তার প্রেমে পড়ে ছিলাম। বড় অসম ছিল সেই প্রেম। তোমার বাবা আমাকে বুঝাতে চেয়েছে অনেক। কিন্তু আমি জানতাম সেও ভালবেসে ফেলেছে আমাকে।

কথা থামিয়ে উড়নায় চোখ মুছে সুরভী। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে। আমার শরীর অবশ হয়ে আসতে ছিল। মনে হচ্ছে ভয়ানক কোন দুঃস্বপ্ন দেখছি আমি। তারপর কি হল?

সে কিছুটা ক্লান্ত যেন। তারপর দায়সরা উত্তর দেয় আর কি হবে? তোমার বাবা এক সময় আমার কাছে স্বিকার করলো যে সেও আমাকে ভালবাসে। তারপর সে গ্রামে বাড়ি বানালো। সে জানতো তোমার মা শহরের মেয়ে সে কোনদিন গ্রামে আসবে না। গ্রামে থাকবো আমরা দু’জন। বাড়ি বানানো যখন শেষ তখন সে আমার জোড়াজুড়ির কারনে নিয়ে আমাকে এই অভিশপ্ত বাড়িতে নিয়ে আসলো। সারা রাত ট্রেন জার্নি কওে বেশ ক্লান্ত ছিলাম। সে তাই আমাকে বললো তুমি ঘুমাও আমি এখন যাচ্ছি বিকেলের আগেই ফিরবো। তারপর বিকেল গড়িয়ে রাত.. ..। সে আর এলনা। বন্দি আমি না খেয়ে দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে দিলাম আরো একটা দিন। কেউ এল না। তৃতীয় দিন এত বেশি দূর্বল হলাম যে নড়তে পারলাম না। ভারি অভিমান হল আমার। মনে হল তোমার বাবা আমাকে খুন করার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছে। সে আমাকে না খাইয়ে মেরে ফেলার জন্যই আমাকে রেখে ভেগেছে। তখন চারদিক ছিল জনশূন্য এখনের মত এত বাড়ি ঘর ছিলনা। চিৎকার করে ছিলাম অনেক কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নী। তাই ধুকে ধুকে না মরে অভিমান করে উড়না দিয়ে আতœহত্যা করলাম।

সুরভী কথা থামিয়ে আমার দিকে তাকালো। কষ্টে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছিল। নিয়তির নির্মমতায় একটি তাজা প্রাণের অপমৃত্য মানতে পারছিলাম না। আমি বললাম আপণী এখন হয়ত জানেন বাবা সেই রাতে বাস এ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়ে ছিলেন।

সুরভী ফ্যাকাসে হেসে বললো এসব জেনে আর লাভ কি?

আমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম। যখন উঠলাম তখন সকাল হয়ে গিয়েছে। রাতের ঘটনা মনে পড়ল। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। তারমানে আমি স্বপ্ন দেখে ছিলাম? হাফ ছেড়ে বাচলাম!

বিছানা থেকে উঠে শাবল দিয়ে পূর্বের রুমের তালা ভেঙে ফেললাম। আতকে উঠে চিৎকার দিলাম! ফ্লোরে পড়ে আছে সুরভীর কংকাল।

              


                                                               ( সমাপ্ত )

Facebook Twitter RSS